কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার

কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার: ক্যারিয়ার প্রোফাইল - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

হাউজিং বা আবাসনের জন্য রিয়েল এস্টেট কোম্পানীগুলোর পসার বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ ভালো। এছাড়াও নির্মাণ বা কনস্ট্রাকশন কোম্পানীগুলো বড় দালান বা বহুতল বাসভবন নির্মাণ ছাড়াও বিভিন্ন বাণিজ্য ভবনসহ সেতু নির্মাণের কাজ পর্যন্ত করে থাকে। সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সরকারি ভবন নির্মাণ, খনিজ উপাদান উত্তোলন বা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রজেক্টের ক্ষেত্রে সাময়িক বা স্থায়ী বাসস্থান নির্মাণের কাজেও রিয়েল এস্টেট বা কনস্ট্রাকশন কোম্পানীগুলোকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারকে নিয়োগ দেওয়া হয় একটি প্রজেক্টের নির্মাণের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে। তবে প্রজেক্টের সামগ্রিক দায়িত্ব একজন প্রজেক্ট ম্যানেজারের হাতে ন্যস্ত থাকে।

এক নজরে একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার

সাধারণ পদবী: কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার (DBA)
বিভাগ: অবকাঠামো নির্মাণ
প্রতিষ্ঠানের ধরন:সরকারি, প্রাইভেট ফার্ম/কোম্পানি
ক্যারিয়ারের ধরন: ফুল টাইম, চুক্তিভিত্তিক
লেভেল: মিড
অভিজ্ঞতা সীমা: ২ – ৩ বছর
বেতনসীমা: ৳৩০,০০০ – ৳৮০,০০০
সম্ভাব্য বয়সসীমা: ৩৫ – ৪০ বছর
মূল স্কিল: ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত নির্মাণের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান
বিশেষ স্কিল: সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনা, সময় ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগের দক্ষতা

একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার কোথায় কাজ করেন?

  • রিয়েল এস্টেট কোম্পানি;
  • সেতু নির্মাণের পাশাপাশি সেতু নির্মাণের জন্য সাময়িক বা স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে বিভিন্ন ভবন ও রেস্ট হাউজ তৈরি করে এমন প্রতিষ্ঠান। মোদ্দা কথা সেতু নির্মাণের কাজে যারা নিয়োজিত থাকেন তাদেরকে সাময়িকভাবে থাকার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থান করা হয়। এক্ষেত্রে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ বাসস্থান হিসেবে ভবন তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্টের ক্ষেত্রে। সেতু নির্মাণ ছাড়াও বিদ্যুৎ বা গ্যাস কেন্দ্র, অফিস ক্যাম্পাস, ভবন নির্মাণের কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বিষয়টি প্রায় একই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যমুনা সেতু এবং তিস্তা সেতু – উভয়ের নির্মাণ কাজ চালনার জন্য যারা নিয়োজিত ছিলেন তাদের জন্য সেতু থেকে কাছেই অবস্থিত কিছু এলাকায় অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যমুনা সেতুর নির্মাণকালে যে ভবনগুলো নির্মিত হয়েছিল সেগুলো থেকে গেছে পরে;
  • বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান;
  • রিয়েল এস্টেট না এমন কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান;
  • কিছু শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠান যেগুলো বেশ নিয়মিত বিভিন্ন নির্মাণ কাজ সম্পাদন করে থাকে নিজেদের সুবিধার জন্য বা উৎপাদন চাহিদা মেটানোর জন্য।
  • অনেকক্ষেত্রে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারকে সাইট ম্যানেজার হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।

একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার কী ধরনের কাজ করেন?

  • সামগ্রিক নির্মাণ কাজ তত্ত্বাবধান করা;
  • ডিজাইন বা নকশা অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছে কিনা তা দেখা;
  • নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত মাসিক লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করা এবং প্রয়োজনে তা নিশ্চিত করা;
  • নির্মাণ প্রজেক্টে যারা কাজ করছেন (শ্রমজীবী যারা নিয়োজিত আছেন) তাদের সুযোগ-সুবিধা ও সমস্যার ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা;
  • একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের অধীনে সাধারণত পুরকৌশল প্রকৌশলী থাকেন বেশ কয়েকজন। তাদেরকে বিভিন্ন দিকের কাজ ভাগ ও নির্দিষ্ট করে দেওয়ার দায়িত্ব একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের;
  • রড, সিমেন্ট, ইটসহ সব ধরনের নির্মাণ দ্রব্যাদির মান খেয়াল করতে হয় এবং এগুলোর পরিমাণ ঠিক আছে কিনা তারও হিসাব রাখার দায়িত্ব একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের উপর বর্তায়। কনস্ট্রাকশন সাইটে ইট ও রড হারানো বা চুরি যাওয়ার ঘটনা বেশ নিত্তনৈমিত্তিক একটি ব্যাপার। এক্ষেত্রে আপনি কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার হলে আপনাকে জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও রাখতে হবে যদি কোন চুরির ঘটনা ঘটে;
  • বাজেট এবং নির্মাণ খরচের নিয়মিত ও সম্পূর্ণ হিসাব একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের তৈরি করতে হয়;
  • কন্সট্রাকশন ম্যানেজার সাধারণত প্রজেক্ট ম্যানেজারের অধীনে কাজ করেন। সেক্ষেত্রে প্রজেক্ট ম্যানেজারের কাছে নিয়মিত তার কাজের রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়?

মনে রাখা জরুরী, কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার একটি বড় পদ। এক্ষেত্রে তাই অভিজ্ঞতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাধারণত প্রকৌশলী হিসেবে বেশ কয়েক বছর কাজ করার মাধ্যমে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হওয়ার পরেই শুধুমাত্র কেউ কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন। এক্ষেত্রে তাই বেশ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। আপনি কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার হতে চাইলে নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো থাকতে হয় সাধারণত –

শিক্ষাগত যোগ্যতাঃপুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিষয়ে স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রি সাধারণত প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়। তবে কাজ ও প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষাগত যোগ্যতা ভিন্ন হতে পারে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যেমন সাধারণত যন্ত্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং স্নাতক ডিগ্রি আছে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার পুরকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিও চাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরকৌশল বিষয়ে ডিপ্লোমা আছে এমন কাউকেও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

বয়সঃ এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয় দেখে সাধারণত একটি ন্যূনতম বয়স নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছরের ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে অনেকক্ষেত্রে বয়স তেমন বড় একটা বাধা হয় না নিয়োগ পাওয়ার জন্য।

অভিজ্ঞতাঃ অভিজ্ঞতার বিষয়টি পুরোপুরিই প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষ। ছোট প্রতিষ্ঠান বা প্রজেক্টের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা আছে এমন ব্যক্তিদের খোঁজা হয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক থাকে। গড় হিসাবে সাধারণত ৯ থেকে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আপনি সরাসরি কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার বা জেনারেল ম্যানেজার (কনস্ট্রাকশন) পদে নিয়োগ পেতে চাইলে সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। সহকারী জেনারেল ম্যানেজারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা সাধারণত ১০ বছরের বেশি হয়।

একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের কী ধরনের দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হয়?

  • আপনি কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার হলে আপনার নেতৃত্বগুণ ভালো হতে হবে যাতে আপনি নির্মাণ শ্রমিক এবং আপনার অধীনস্ত কর্মকর্তা সহ সকলের কাজ মনিটর করতে পারেন;
  • সাফল্যের ব্যাপারে কোন আপস করা যাবে না। কাজ সময়মত শেষ করার ক্ষেত্রে মনোযোগী এবং উদ্যমী হতে হবে;
  • মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল, প্রজেক্ট, অটোক্যাড(Auto-CAD) ও হিসাবের সফটওয়্যার এর কাজে পারদর্শী হতে হবে;
  • স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বা ভবন নকশার ক্ষেত্রে সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক;
  • নির্মাণ খরচ এবং লাভের বিষয়ে ভালো ধারণা থাকতে হবে এবং কাজের ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করতে হবে;
  • নির্মাণ পণ্য ও দ্রব্য নিয়ে ভালো ধারণা থাকা জরুরী;
  • নির্মাণস্থলে কাজ করছেন এমন অনেকের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদ বা সমস্যার সমাধানে পারদর্শী হওয়া জরুরী নইলে সাফল্যের সাথে কাজ সমন্বয় করা সম্ভব হবে না।

একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের মাসিক আয় কেমন?

কাজ ও প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষ। প্রতিষ্ঠানের আকার ও পদের ধরনের উপর ভিত্তি করে মাসিক সম্মানী প্রদান করা হয় এক্ষেত্রে। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়া হয় বলে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের মাসিক আয় সাধারণত বেশ বড় পরিমাণের হয়। কিছু ক্ষেত্রে সাইট ম্যানেজার বা কন্সট্রাকশন ম্যানেজারের মাসিক আয় ২২ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকার মত হতে পারে। আবার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক বা কন্সট্রাকশন ম্যানেজারের মাসিক আয় ৮০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ টাকার মত হতে পারে।

একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজারের ক্যারিয়ার কেমন হতে পারে?

এখানে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষ। কিছু ক্ষেত্রে আপনি কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন আবার কিছু ক্ষেত্রে সহকারী ব্যবস্থাপক বা সহকারী প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে পদোন্নতির মাধ্যমে প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং ব্যবস্থাপক (কন্সট্রাকশন) হিসেবে আপনি কাজ করতে পারেন। সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আপনি নিয়োগ পেতে পারেন। অনেকক্ষেত্রে আবার সাইট ম্যানেজারের পরবর্তী পদকে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার বলা হয়। সেক্ষেত্রে সাইট ম্যানেজার বা প্রকৌশলী হবে নিয়োগের পরে আপনার প্রথম পদ।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

হাসান ইমাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপসিলন ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, ১৯৯৭ – বর্তমান

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।