প্রাথমিক শিক্ষক

প্রাথমিক শিক্ষক: ক্যারিয়ার প্রোফাইল - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

একজন প্রাথমিক শিক্ষক প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শিক্ষাদানের কাজ করেন। সাধারণত সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্ত থাকেন।

১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন’ গৃহীত হয়। প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোকে শক্তিশালী করা, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের আগস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ (Primary and Mass Education Division-PMED) নামে একটি নতুন বিভাগ গঠিত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এ প্রাথমিক শিক্ষা খাতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষক নিরলস পরিশ্রম করে ২ কোটির অধিক শিক্ষার্থীকে পাঠ দান করছেন।

এক নজরে একজন প্রাইমারি শিক্ষক/শিক্ষিকা

সাধারণ পদবী: সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক
বিভাগ: শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানের ধরন: সরকারি, বেসরকারি
ক্যারিয়ারের ধরন: ফুল টাইম
লেভেল: এন্ট্রি, মিড
অভিজ্ঞতা সীমা: প্রযোজ্য নয়, তবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ আবশ্যক
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য বেতনসীমা: ৳১২,০০০ – ৳২০,০০০
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য বয়সসীমা: ২১ – ৩০ বছর
মূল স্কিল: পাঠ্যসূচি নিয়ে জ্ঞান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে সক্ষমতা, প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা
বিশেষ স্কিল: ধৈর্য, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা

কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে একজন প্রাইমারি শিক্ষক/শিক্ষিকা কাজ করেন?

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রধানত চার ধরনের বিদ্যালয় রয়েছে। যথা – সরকারি বিদ্যালয়, পরীক্ষণ বিদ্যালয় যা প্রাইমারি ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের (PTI) সাথে সংযুক্ত, নিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কমিউনিটি বিদ্যালয়। এছাড়া রয়েছে অনিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাই স্কুল সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন এবং কিছু এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষকদের পদ রয়েছে।

একজন প্রাইমারি শিক্ষক/শিক্ষিকা কী ধরনের কাজ করেন?

  • শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক বজায় রেখে একজন শ্রেণী শিক্ষক শিক্ষার্থীর সুখে-দুখে, সাফল্য-ব্যর্থতায় সব সময় পাশে থাকবেন;
  • পেশাদারী এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে একজন শ্রেণী শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব সময় সকল শিক্ষার্থীর জন্য একই রকম ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন;
  • কোন শিক্ষার্থী ক্লাসে পাঠ না বুঝলে ক্লাসের পর বিশেষভাবে তাকে বুঝিয়ে দিবেন;
  • শিক্ষার্থী উপস্থিতির তালিকা তৈরি করবেন;
  • যথাযথ উপকরণ ব্যবহার ও পাঠ পরিকল্পনা করে অংশ গ্রহন মুলক ক্লাস নিবেন;
  • শিক্ষার্থীর প্রতি একজন শ্রেণী শিক্ষকের আচরণ বা দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় হবে ইতিবাচক। তিনি নেতিবাচকতা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করবেন;
  • নিজস্ব চিন্তা-চেতনা,ব্যক্তিত্ব,মেধা যোগ্যতা, মননশীলতা আর আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে শ্রেণীর কার্যক্রম পরিচালনা করবেন;
  • শিক্ষার্থীদেরকে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সামাজিক বিষয়ে সচেতন করে তুলবেন;
  • শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ গঠনে সাহায্য করা ও গণতান্ত্রিক মনোভাব গড়ে তুলবেন;
  • একজন প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের সকল নির্বাহী দায়িত্ব পালন করবেন;
  • শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন করবেন এবং দিবসের তাৎপর্য সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলবেন;
  • পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান দিবেন।

একজন প্রাইমারি শিক্ষকের/শিক্ষিকার কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হতে হলে কমপক্ষে দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক পাশ হতে হবে। সহকারী শিক্ষক হসেবে আবেদন করতে পুরুষদের কমপক্ষে দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে, নারীদের উচ্চমাধ্যমিক পাশ হতে হবে। সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে নারীদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক পাশ করা হবে।বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হলে কাউকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এমন ব্যক্তিকে বিবাহ করেছেন অথবা বিবাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন এমন ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।ব্র্যাক, প্রশিকার মত এনজিও অনুন্নত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য স্কুল পরিচালনা করে। এসব স্কুলের শিক্ষকতা করতে চাইলে বিশেষ কোন ডিগ্রির প্রয়োজন পড়েনা। এসএসসি বা এইচএসসি পাশ হলে এবং শিক্ষাদানে সমর্থ হলেই এসব স্কুলে শিক্ষক হওয়া সম্ভব।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ২১ থেকে ৩০ বছর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে আবেদনের বয়সসীমা ১৮-৩০ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছর।

সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ৬০ ভাগ নারী , ২০ ভাগ পুরুষ ও ২০ ভাগ পোষ্য কোটা (বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলে ও অবিবাহিত মেয়ে) অনুসরণ করে থাকে। বিদ্যমান এসকল কোটার মধ্যে আবার মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও প্রতিবন্ধী কোটা আছে।

একজন প্রাইমারি শিক্ষকের/শিক্ষিকার কী ধরনের দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হয়?

  • একজন শ্রেণী শিক্ষক যে বিষয়টিতে শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করবেন সে বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে;
  • একজন শ্রেণী শিক্ষককে শিক্ষার্থীর আচরণ দেখে তার মনের ভাষা বুঝতে হবে;
  • একজন শ্রেণী শিক্ষককে সময়ানুবর্তি হতে হবে;
  • ধৈর্যশীলতা একজন শিক্ষকের অন্যতম গুণ;
  • প্রাথমিক শিক্ষা পরিচিতি, প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং বিভিন্ন দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে জ্ঞান রাখতে হবে;
  • বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা(নীতি,কৌশল,সংগঠন) সম্পর্কে জানতে হবে;
  • শিশু মনো বিজ্ঞান, শিখন ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের মূল্যায়ন করতে জানতে হবে;
  • শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হতে হবে
  • শিক্ষার্থীদের কাছে শ্রেণীর পাঠ আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

কোথায় পড়াশুনা করবেন একজন প্রাইমারি শিক্ষক/শিক্ষিকা হতে চাইলে?

প্রাথমিক শিক্ষকের প্রশিক্ষণের জন্য আছে তিনটি বেসরকারিসহ ৫৯টি প্রাথমিক শিক্ষক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (PTI)। এর মধ্যে সরকারি PTI এর সংখ্যা ৫৫ টি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এক বছর মেয়াদী সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি দেওয়া হয়। ন্যাশনাল একাডেমী ফর প্রাইমারি এডুকেশন(NAPE) থেকে দেড় বছর মেয়াদী ডিপিএড(Diploma-in-Primery Education) ডিগ্রি দেওয়া হয়। NAPE এর উদ্যোগে বাংলাদেশের পিটিআইসমূহে চলমান ১ বৎসর মেয়াদী সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন প্রশিক্ষণ কোর্সটি পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে দেড় বৎসর মেয়াদী ডিপিএড প্রোগ্রাম চালু হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পাইলট কার্যক্রম শেষ হয়ে গিয়েছে (সূত্রঃ প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট)। গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট প্রাথমিক শিক্ষকরা সরকারের অনুমতি নিয়ে এক বছরের ব্যাচেলর-ইন-এডুকেশন (বিএড) ডিগ্রি, এমনকি এমএড কোর্সও করতে পারেন।

একজন প্রাইমারি শিক্ষকের/শিক্ষিকার কাজের ক্ষেত্র এবং সুযোগ কেমন?

বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৮০,৪০১ টি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৩,৬০১ টি। শহর,গ্রাম,চরাঞ্চল, হাওড়,পাহাড় সব স্থানেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ যার মধ্যে সরকারি ৩ লক্ষ ২২ হাজার ৭৬৬ জন (সূত্রঃ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর)। ২০১১ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়েছে। এর ফলে মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে আরো অধিক শিক্ষকের প্রয়োজন। ২০১৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ২০ হাজার ৮৪৭টি। সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১৭ হাজার সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। দেশের অর্ধিত জনসংখ্যা আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির প্রয়াসে সরকার বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ১৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে নতুন করে আরো সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকের প্রয়োজন হবে।

সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী শুরুতে একজন সরকারি প্রাথমিক প্রধান শিক্ষকের মূল বেতন ১২৫০০ টাকা আর অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে সর্বমোট ১৯৮০০ টাকা। সহকারী শিক্ষকের মূল বেতন ৯৭০০ টাকা এবং অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে সর্বমোট ১৬২৫০ টাকা। তবে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট(PTI) থেকে প্রশিক্ষণ লাভের পর বেতন বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমপিও ভুক্ত শিক্ষকরা তাদের বেতনের শতকরা ৯০ ভাগ এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সরকার থেকে পেয়ে থাকে। কমিউনিটি স্কুলের শিক্ষকরা সরকার থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে ভাতা পান

ক্যারিয়ার কেমন হতে পারে একজন প্রাইমারি শিক্ষকের/শিক্ষিকার?

একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক হওয়া সম্ভব। প্রধান শিক্ষক পদের শতকরা ৩৫ ভাগ বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ দেয় এবং বাকি ৬৫ ভাগ সহকারী শিক্ষক হতে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি, সহকারি শিক্ষক পদে ৭ বছরের সন্তোষজনক চাকরি এবং সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন অথবা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন অথবা ব্যাচেলর ইন এডুকেশন ডিগ্রি থাকতে হবে। প্রাইমারি প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি হয়ে অন্য কোন বিভাগে কাজের সুযোগ নেই। তবে তারা নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে উপজেলা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তা হবার সুযোগ পান। গ্রামাঞ্চলে কিংবা ছোট শহরে একজন প্রাইমারি শিক্ষক অনেক সম্মানিত ব্যক্তি। গ্রামে প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে অনেক কমিটির সদস্য হন।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

কাজী সুদীপ্তা জামান, প্রধান শিক্ষক, ৩ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাগুরা সদর উপজেলা, মাগুরা

Loading

2 thoughts on “প্রাথমিক শিক্ষক

    1. সরাসরি যে কেউ PTI Training গ্রহণ করতে পারে না। এর জন্য প্রথমে প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ করে, প্রাইমারি শিক্ষক হতে হবে। তারপর শিক্ষকের জন্য PTI Training এর ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া এডুকেশন বিষয়ক বিভিন্ন ট্রেনিং করানো হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। আগ্রহী হলে সেখানে গ্রহণ করতে পারেন এডুকেশন বিষয়ক নানা ট্রেনিং। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।