ফিজিওথেরাপিস্ট

ফিজিওথেরাপিস্ট: ক্যারিয়ার প্রোফাইল - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

একজন ফিজিওথেরাপিস্ট সাধারণত অসুস্থতা, আঘাত ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতা থেকে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসার কাজ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একজন রোগী কোন প্রকার রেফারেন্স ছাড়াই সরাসরি ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

এক নজরে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট

সাধারণ পদবী:ফিজিওথেরাপিস্ট, ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট
বিভাগ: স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
প্রতিষ্ঠানের ধরন: সরকারি, বেসরকারি
ক্যারিয়ারের ধরন: ফুল টাইম, পার্ট টাইম
লেভেল: এন্ট্রি, মিড
এন্ট্রি লেভেলে অভিজ্ঞতা সীমা: ন্যূনতম ১ বছর
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য গড় বেতন: ৳১৫,০০০ – ৳৩০,০০০
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য বয়স সীমা: কাজসাপেক্ষ
মূল স্কিল: অ্যানাটমি, অস্থিতত্ত্ব, রক্তসঞ্চালন, দেহের পেশীবিন্যাস ও স্নায়ুতন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা
বিশেষ স্কিল: ইলেকট্রোথেরাপিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির ব্যবহার জানা, সেবার মানসিকতা থাকা, যোগাযোগের দক্ষতা

একজন ফিজিওথেরাপিস্ট কোথায় কাজ করেন?

  • সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, যেমনঃ পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় ট্রমা সেন্টার
  • সরকারি-বেসরকারি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র
  • ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র
  • স্পোর্টস দল ও ক্লাব

১৯৬০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশা আত্মপ্রকাশ করে। ঐ বছর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রতিবন্ধী শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য প্রথম ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ফিজিওথেরাপি বিভাগ ও স্নাতকোত্তর অর্থোপেডিকস কোর্সের সঙ্গে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক কোর্স চালু হয়।

এখন বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন ফর দ্য প্যারালাইজড (CRP), হ্যান্ডিক্যাপ বাংলাদেশ, বিভিন্ন পুনর্বাসন প্রকল্প, স্পোর্টস দল, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শারীরিক শিক্ষার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজের সুযোগ আছে ফিজিওথেরাপিস্টদের। বাংলাদেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিস্টের সংখ্যা প্রায় ১৮০০, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম (সূত্রঃ দৈনিক খোলা কাগজ, ৩০ নভেম্বর,২০১৬)।

বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইন্সটিটিউট থেকে ফিজিওথেরাপিতে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৩৩ ভাগই কাজ করেন সিআরপিতে। শতকরা ১৪ ভাগ কর্মরত আছেন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য এনজিওতে। শতকরা ১৬ ভাগ বিদেশে কাজ করেন বা পিএইচডিতে অধ্যয়নরত। বাকিরা বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছেন (সূত্রঃ দৈনিক শিক্ষা, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭)।

একজন ফিজিওথেরাপিস্ট কী ধরনের কাজ করেন?

শরীরের নড়াচড়া সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট চিকিৎসা দেন –

  • বাত
  • ব্যথা
  • হাড় ক্ষয়জনিত রোগ
  • আর্থ্রাইটিস
  • মাংসপেশীর দুর্বলতা
  • প্যারালাইসিস
  • নার্ভ ইনজুরি
  • শারীরিক প্রতিবন্ধিতা
  • বিকলাঙ্গতা
  • সাধারণ ইনজুরি
  • স্পোর্টস ইনজুরি

একজন ফিজিওথেরাপিস্টের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে –

  • রোগীর বর্ণনাসাপেক্ষে ও শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা;
  • রোগীর চিকিৎসায় ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপিউলেটিভ থেরাপি, মুভমেন্ট উইদ মোবিলাইজেশন, হাইড্রোথেরাপিসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা;
  • প্রয়োজনে ইনফ্রা রেড রে (IRR) বা ট্রান্সকিউটেনিয়াস ইলেক্ট্রিক্যাল নার্ভ সিমুলেশনের (TENS) মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে ইলেকট্রোথেরাপি দেয়া;
  • রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায়ামের পরামর্শ ও নির্দেশনা দেয়া।

উল্লখ্য যে, ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগীদেরকে ঔষধ প্রেসক্রাইব করতে পারলেও বাংলাদেশে কোন ফিজিওথেরাপিস্ট কাউন্সিল না থাকায় এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই।

একজন ফিজিওথেরাপিস্টের কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়?

শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ ফিজিওথেরাপিস্ট হতে হলে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওথেরাপিতে স্নাতক ডিগ্রি নিতে হবে। ফিজিওথেরাপিতে স্নাতক ডিগ্রিধারীরা পরিচিত কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট নামে। অন্যদিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের বলা হয় ফিজিওথেরাপি স্পেশালিস্ট।

ফিজিওথেরাপিতে আছে ডিপ্লোমা ডিগ্রির সুযোগ। যারা ফিজিওথেরাপিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেন, তারা অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট হিসাবে কাজের সুযোগ পান। বাংলাদেশে হেলথ টেকনোলজিস্টরা এ পদে কাজ করেন। এছাড়া অনেকে এক বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্টের কাজ করতে পারেন। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্টকে অবশ্যই কোন ফিজিওথেরাপিস্টের অধীনে কাজ করতে হবে। তিনি স্বাধীনভাবে কোন রোগীকে সেবা দিতে পারবেন না।

অভিজ্ঞতাঃ ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করতে হলে অবশ্যই কোন প্রতিষ্ঠানে আগে ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা নিতে হবে।

একজন ফিজিওথেরাপিস্টের কী ধরনের দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হয়?

  • ফিজিওথেরাপির আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত থাকা;
  • ফিজিওথেরাপিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জানা;
  • রোগীর সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা।

ফিজিওথেরাপি মূলত একটি ঔষধবিহীন চিকিৎসা পদ্ধতি। রোগীকে ঔষধ দিতে হলে আপনাকে ফার্মাকোলজি বিষয়ে আলাদা কোর্স করতে হবে।

ভালো ফিজিওথেরাপিস্ট হতে হলে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর উদ্যোগে মেডিসিন, নিউরোলজি ইত্যাদি বিষয়ের উপর আয়োজিত সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া জরুরি।

কোথায় পড়বেন ফিজিওথেরাপি নিয়ে?

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি নিয়ে পড়ার সুযোগ এখনো সীমিত। মোট ৭টি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিতে ৫ বছর মেয়াদী বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি দেওয়া হয়, যার মধ্যে শেষ এক বছর ইন্টার্নশিপ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান ৫টি। এর মধ্যে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন (NITOR) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত দ্য ইন্সটিটিউট অফ হেলথ টেকনোলজি-ঢাকা (IHT) সরকারি প্রতিষ্ঠান।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সাইক ইন্সটিটিউট অফ মেডিকেল টেকনোলজি, স্টেট কলেজ অফ হেলথ সায়েন্সেস ও সিআরপির অঙ্গসংস্থা বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইন্সটিটিউট (BHPI)। বিএইচপিআই থেকে বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপির পাশাপাশি বিএসসি ইন অকুপেশনাল থেরাপি ও বিএসসি ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি ডিগ্রি দেয়া হয়। এখানে মাস্টার্স অফ ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি ও ২ বছর মেয়াদী এমএসসি ইন ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি দেয়া হয়।

ইন্সটিটিউট অফ হেলথ টেকনোলজি-রাজশাহী (IHT) থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি এস সি ইন ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি নিতে পারেন।

বাংলাদেশের অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (MATS) ও ইন্সটিটিউট অফ হেলথ টেকনোলজি (IHT) থেকে ফিজিওথেরাপিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেয়া হয়।

একজন ফিজিওথেরাপিস্টের মাসিক আয় কেমন?

শুরুতে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে মাসিক ৳১৭,০০০ – ৳২০,০০০ আয় করতে পারেন। তবে এনজিও ও বিভিন্ন পুনর্বাসন প্রকল্পে গড়ে ৳৩০,০০০ – ৳৩৫,০০০ বেতন দেয়া হয়। এর বাইরে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ব্যক্তিগত পর্যায়ে চর্চা করেও অর্থ উপার্জন করতে পারেন।

অভিজ্ঞ ও দক্ষ হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিআরপি কিংবা হ্যান্ডিক্যাপ বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানে লাখ টাকার চাকরি পাওয়া যায়। অন্যদিকে ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্টদেরকে শুরুতে জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেড অনুযায়ী বেতন দেয়া হয়।

একজন ফিজিওথেরাপিস্টের ক্যারিয়ার কেমন হতে পারে?

অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট (ডিপ্লোমাধারীদের ক্ষেত্রে) বা ফিজিওথেরাপিস্ট (স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে) হিসাবেই আপনার ক্যারিয়ার শুরু হবে। বিশেষজ্ঞ হতে হলে কিংবা ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে হলে উচ্চতর ডিগ্রি ও দক্ষতার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তার আগের সময়টুকু কাজ করে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। এ অভিজ্ঞতা আপনার ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে।

উন্নত বিশ্বে ফিজিওথেরাপিস্ট অন্যতম পছন্দের পেশা হলেও বাংলাদেশে এ পেশা এখনো অনেক চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ সরকার এখন প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাতগ্রস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করায় ফিজিওথেরাপিস্টদের জন্য সরকারি চাকরির সুযোগ বেড়েছে।

ফিজিওথেরাপির যথেষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা থাকলে আন্তর্জাতিক এনজিওতে উচ্চপর্যায়ে কাজ করা সম্ভব। এছাড়া, ফুটবল, হকি, ভলিবলসহ অন্যান্য জাতীয় দলে ফিজিও কনসালট্যান্টের কাজ করে গড়ে তোলা সম্ভব আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি বিভাগের শিক্ষক কিংবা শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতায় ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সুযোগ আছে।

একটা বিষয় সবসময় মনে রাখা দরকার। এ পেশা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত। আপনার জ্ঞান-দক্ষতা আর আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাঁচাতে পারেন বহু মানুষের জীবন।

Loading

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।