বায়োটেকনোলজিস্ট

বায়োটেকনোলজিস্ট: ক্যারিয়ার প্রোফাইল - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বায়োটেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ আগে তেমন একটা ছিল না। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হয়েছে। কাজের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এক্ষেত্রে পড়াশোনা করার সুযোগও বেড়েছে সময়ের সাথে সাথে।

এক নজরে একজন বায়োটেকনোলজিস্ট

সাধারণ পদবী: বায়োটেকনোলজিস্ট (DBA)
বিভাগ: জীববিজ্ঞান
প্রতিষ্ঠানের ধরন: প্রাইভেট ফার্ম/কোম্পানি
ক্যারিয়ারের ধরন: ফুল টাইম, চুক্তিভিত্তিক
লেভেল: এন্ট্রি, মিড
অভিজ্ঞতা সীমা: ২ – ৩ বছর
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য বেতনসীমা: ৳২০,০০০ – ৳৩৫,০০০
সম্ভাব্য বয়সসীমা: ২৬ – ৩৫ বছর
মূল স্কিল: জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান, জৈবপ্রযুক্ত সম্পর্কিত সম্যক ধারণা
বিশেষ স্কিল: গবেষণার দক্ষতা, যোগাযোগের দক্ষতা, ধৈর্য

একজন বায়োটেকনোলজিস্ট কোথায় কাজ করেন?

  • বায়োটেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করতে চাইলে আপনার একটি কর্মক্ষেত্র হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। যাদের ব্যাচেলর বা অনার্স ডিগ্রি পাসের সময় ফলাফল ভালো থাকে তারা সাধারণত এদিকে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি আপনি গবেষক হিসেবেও কাজ করতে পারবেন এবং বায়োটেকনোলজিস্ট হিসেবে অবদান রাখার সু্যোগ থাকছে আপনার;
  • এছাড়াও ফার্মাসেউটিক্যালস প্রতিষ্ঠানগুলোতে আপনাকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে। কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে কাজ না করতে চাইলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে বায়োটেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ আছে বাণিজ্যিকীকরণের কাজে নিয়োগ পাওয়ার মাধ্যমে;
  • সরকারি ক্ষেত্রে কাজ করতে চাইলে বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (BCSIR)-এ সায়েন্টিস্ট বা বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার সুযোগ আছে। গবেষক হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়ারিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (ICDDR, B)-এ কাজ করার সুযোগ আছে রিসার্চ অফিসার হিসেবে। এক্ষেত্রে বায়োটেকনোলজিস্টের কাজ সাধারণত নতুন কোন জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেই নিয়োজিত থাকে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন-এও কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষক হিসেবে বায়োটেকনোলজিস্টদের নিয়োগ দেওয়া হয়।;

একজন বায়োটেকনোলজিস্ট কী ধরনের কাজ করেন?

  • বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের ক্ষেত্রে একজন বায়োটেকনোলজিস্টকে শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণার কাজও সম্পাদন করতে হয়। শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি সাধারণত আপনার গবেষণা কাজের তাৎপর্য ও মানের উপর নির্ভর করে। তাই গবেষণার কাজ বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে;
  • কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে কাজ করতে চাইলে ঔষধ তৈরি এবং ঔষধের গুনগত মান পরীক্ষা করতে হয়। এক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্র সাধারণত ঢাকার বাইরে ঔষধ কারখানাগুলোতে হয়। প্রোডাকশন প্ল্যান্টগুলো ঢাকার বাইরে হওয়াতেই কর্মক্ষেত্র ঢাকার বাইরে হয় মূলত। ফার্মেসী এবং কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এমন ব্যক্তিদের পাশাপাশি বায়োটেকনোলজি বিষয়ে ডিগ্রি আছে এমন ব্যক্তিদেরও সাধারণত নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে শুধুমাত্র ইনসেপটা ফার্মাসেউটিক্যালস লিমিটেড-এ এখন পর্যন্ত ভ্যাক্সিন প্রোডাকশন ইউনিট আছে যেখানে সরাসরি বায়োটেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়।;
  • মার্কেটিং-এর কাজে আপনাকে নিয়োজিত করা হলে পণ্য বাণিজ্যিকীকরণের দিকে আপনার নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে পণ্যের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে বিক্রি বাড়ানোর জন্যও আপনাকে কাজ করতে হবে। পণ্যের নাম ব্র্যান্ড হিসেবে চালু করাটাও এক্ষেত্রে আপনার কাজের একটি লক্ষ্য হতে পারে;
  • গবেষণার কাজের ক্ষেত্রে সাধারণত আপনাকে সেন্ট্রিফিউজ, ফ্লাস্ক, স্পেক্ট্রোফটোমিটারসহ প্রভৃতি যন্ত্র ঠিকঠাক রাখা এবং পরীক্ষা দেখভাল করতে হয়। এছাড়াও গবেষণার নকশা ও পরিকল্পনা ঠিক করা, গবেষণার উদ্দেশ্য ঠিক করা এবং গবেষণালব্ধ পরীক্ষার ফলাফলের অনুমানলব্ধ লাভজনক দিকগুলো খুঁজে বের করা লাগে এবং নির্দিষ্ট করা লাগে। ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়েও সাধারণত গবেষক হিসেবে কাজ করতে হয়। তবে গবেষণার মূল লক্ষ্য সাধারণত নতুন কোন প্রযুক্তি বা উপকরণ উদ্ভাবন করা যার মাধ্যমে কোন একটি জীবের জীবনবিন্যাস উন্নত ও আরও নিরাপদ করা যায়।

একজন বায়োটেকনোলজিস্ট কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়?

বায়োটেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করতে চাইলে সাধারণত জেনেটিক প্রকৌশল, বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলোতে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি থাকতে হয়। বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন তাই এখনও কর্মক্ষেত্রের ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। তবে জৈবপ্রযুক্তির সাথে কিছু বিষয়ে মিল থাকায় বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রি থাকলেও এই পদগুলোতে আপনাকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে জেনেটিক প্রকৌশল ও বায়োটেকনোলজি বিষয়ে ডিগ্রি থাকা প্রার্থীরা সাধারণত প্রাধান্য পেয়ে থাকেন নিয়োগের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে লক্ষ করুন, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিষয় দুটোর মধ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও বড় পার্থক্য রয়েছে। তবে অল্প কিছু মিলের কারণে সাদৃশ্যমূলক কাজের ক্ষেত্রে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাণিজ্যিকীকরণের কাজে নিয়োগ পেতে চাইলে কিছু ক্ষেত্রে মাস্টার্স ডিগ্রি না থাকলেও সমস্যা হয় না। তবে গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে চাইলে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক।

একজন বায়োটেকনোলজিস্টের কী ধরনের দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হয়?

  • শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হতে চাইলে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষকতা পেশা কঠিন পেশা তাই এক্ষেত্রে আপনার নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। নিয়মিত আধুনিক তথ্য আহরণ করতে না পারলে শিক্ষকতা পেশায় ভালো করা কঠিন এবং গবেষণার কাজও ঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না যা ক্যারিয়ারের জন্য বেশ ক্ষতিকর হতে পারে;
  • গবেষণার কাজের ক্ষেত্রে আপনাকে গবেষণার নকশা, গবেষণার সামগ্রিক পরিকল্পনা ও গবেষণার খুঁটিনাটি বিষয়ে খুব ভালোভাবে জানতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, নিজের ইচ্ছা ও আগ্রহ না থাকলে গবেষণার কাজ সম্পন্ন করা বেশ কঠিন;
  • যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান আহরণ করা জরুরি;
  • কোয়ালিটি কন্ট্রোলের ক্ষেত্রে পণ্যের উপকরণ, গুণ, গুণগত মান এবং প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে গভীর ধারণা থাকা জরুরী;
  • পণ্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে প্রস্তুতপ্রণালী ও গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য প্রোডাকশন প্ল্যান্টে উপস্থিত থেকে তা নিশ্চিত করা জরুরী। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ফার্মেসী পণ্যগুলো বেশ স্পর্শকাতর এবং এক্ষেত্রে একটি ছোট ভুল পরবর্তীতে মারাত্নক আকার ধারণ করতে পারে;
  • বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে যোগাযোগ সমন্বয়, পণ্য বিক্রি বাড়ানোর জন্য কৌশল নির্ণয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা জরুরি এবং ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই কথা বলায় পারদর্শী হতে হবে।

কোথায় পড়বেন?

বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই জৈবপ্রযুক্তি ও জেনেটিক প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হয়। এরকম উল্লেখযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় হল –

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
  • ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া)
  • মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
  • নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
  • ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
  • জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
  • নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

একজন বায়োটেকনোলজিস্টের মাসিক আয় কেমন?

বায়োটেকনোলজিস্টের মাসিক আয় কাজ ও প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষ বিষয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করলে আপনার মাসিক আয় সরকার নির্ধারিত বেতন স্কেল অনুযায়ী নির্দিষ্ট করা থাকবে। প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেলে আপনার মাসিক বেতন হবে ৯ম গ্রেড অনুযায়ী ২২০০০ টাকা। রিসার্চ অফিসার হিসেবে কাজ করলে আপনার মাসিক সম্মানী হবে ৩৫০০০ টাকা থেকে ৪৩০০০ টাকার মধ্যে। কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে কাজের ক্ষেত্রে আপনার মাসিক সম্মানী হতে পারে ২০০০০ থেকে ৩০০০০ টাকার মধ্যে। মার্কেটিং-এর কাজের ক্ষেত্রে মাসিক সম্মানী সাধারণত ২২০০০ টাকা থেকে ৩২০০০ টাকার মধ্যে হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক হিসেবে কাজ করলে আপনার মাসিক আয় হতে পারে ১০০০০ টাকা থেকে ৪০০০০ টাকার মত। বিসিএসআইআর(BCSIR)-এ কাজের ক্ষেত্রে সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ী ৯ম গ্রেডের অন্তর্ভুক্ত হবেন আপনি।

একজন বায়োটেকনোলজিস্টের ক্যারিয়ার কেমন হতে পারে?

প্রভাষক হিসেবে কাজ করলে সর্বোচ্চ অধ্যাপক পর্যন্ত আপনার ক্যারিয়ারে পদোন্নতি হতে পারে। সায়েন্টিস্ট হিসেবে বিসিএসআইআর-এ নিয়োগ পেলে সাধারণত সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হয়ে পরবর্তীতে পরিচালক পদ পর্যন্ত আপনার পদোন্নতি হতে পারে। রিসার্চ অফিসার থেকে সাধারণত সিনিয়র সায়েন্টিস্ট পদ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পদোন্নতি হতে পারে। কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে কাজ করলে আপনার সর্বোচ্চ পদ হতে পারে প্ল্যান্ট ম্যানেজার। অপরদিকে মার্কেটিং-এর কাজের ক্ষেত্রে আপনার সর্বোচ্চ পদ হতে পারে চীফ মার্কেটিং অফিসার।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

১. তাসমিয়া আকতার ঋজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জেনেটিক প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি স্নাতক

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।