বিসিএস অ্যাডমিন

বিসিএস - অ্যাডমিন/প্রশাসন ক্যাডার: ক্যারিয়ার প্রোফাইল - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের সর্বত্র সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে সরকারের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করে থাকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ক্যাডাররা। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে একজন নির্বাহী কর্মকর্তার প্রধান দায়িত্ব সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা, বিভিন্ন ক্যাডারদের কাজের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইন রক্ষা, নির্দেশদান, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত(মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯, ধারা ৫) গঠনের ক্ষমতা রাখেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ক্যাডার হিসেবে উত্তীর্ণ হলে শুরুতে সহকারী কমিশনার বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করতে হয়।

এক নজরে একজন বিসিএস অ্যাডমিন

সাধারণ পদবী: সহকারী কমিশনার/ অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার/ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট
বিভাগ: বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস
প্রতিষ্ঠানের ধরন:জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
ক্যারিয়ারের ধরন: ফুল টাইম। এই পদে অফিস আওয়ার বলতে কিছু নেই। অধিকাংশ সময় মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়
লেভেল: এন্ট্রি
অভিজ্ঞতা সীমা: পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ৫ মাস বি সি এস প্রশাসন একাডেমী ও ৬ মাস সাভারের বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ট্রেনিং দেওয়া হয়।(সূত্রঃ আসিফ ইকবাল, ২৯ তম বিসিএস ক্যাডার, ইউএনও, বিলাইছড়ি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা)
বেতনসীমা: জাতীয় বেতন স্কেলের নবম গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। কর্মস্থল অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মাসিক ৩৫-৩৭ হাজার টাকা।
সম্ভাব্য বয়সসীমা: বিসিএস সার্কুলার যে মাসে দেওয়া হবে সে মাসের প্রথম দিন একজন প্রার্থীর বয়স ২১-৩০ এর মধ্যে হতে হবে। তবে মুক্তিযোদ্ধা সনদধারী ব্যক্তিদের সন্তান, পৌত্র-পৌত্রী ও স্বাস্থ্য ক্যাডারদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর। সাধারণ শিক্ষা, টেকনিক্যাল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারে আদিবাসী প্রার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর
মূল স্কিল: নির্বাহী ও বিচারিক কাজে অভিজ্ঞ হতে হবে। যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা থাকতে হবে। সরকারী আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে জানতে হবে
বিশেষ স্কিল: বিশ্লেষণী চিন্তা, সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়া, ন্যায়পরায়ণতা, সাধারণ জ্ঞান, সবার সাথে মিলেমিশে কাজ করার দক্ষতা।

একজন সহকারী কমিশনার কোথায় কাজ করেন?

বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে অ্যাডমিন ক্যাডার হিসেবে সর্বপ্রথম সহকারী কমিশনারের পদে যোগদান করতে হয়।

  • একজন সহকারী কমিশনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কাজ করেন;
  • নির্বাহী দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সহকারী কমিশনার রাষ্ট্রপতির আদেশবলে কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮ অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচারিক দায়িত্ব পান এবং নির্বাহী আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।

একজন সহকারী কমিশনার কী ধরনের কাজ করেন?

  • মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন;
  • জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে অর্পিত নির্বাহী দায়িত্ব পালন;
  • সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি করা। যেমন গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প, বিভিন্ন পুনর্বাসন প্রকল্প;
  • সিনিয়র সহকারী কমিশনারের অবর্তমানে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব, ভূমি অধিগ্রহণ, জেনারেল সার্টিফিকেট শাখায় দায়িত্ব পালন;
  • সরকারী বিভিন্ন বাস্তবায়িত নীতির ফলাফল যাচাই ও ফিডব্যাক প্রদানে ইউ এন ও এবং জেলা প্রশাসককে সাহায্য করা;
  • এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনাসহ জীবনমান উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা
  • ইট ভাটার লাইসেন্স প্রদান, সার্কাস, যাত্রা, মেলা ইত্যাদির জন্য অনুমতি প্রদান
  • মোটরযানের রেজিষ্ট্রেশন, মোটরযানের মালিকানা সনদ, রোড পারমিট সংক্রান্ত আবেদন গ্রহন ও নিষ্পত্তি
  • আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজ।

একজন সহকারী কমিশনারের কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়?

শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষা পাশের পর কোন স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ৪ বছর মেয়াদী যেকোন বিষয়ে ডিগ্রী থাকলেই বিসিএস এ্যাডমিন ক্যাডারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হন। তবে শিক্ষাজীবনের যে কোন পর্যায়ে ( মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক) একটির বেশি তৃতীয় বিভাগ থাকলে অযোগ্য বিবেচিত হবে।

একজন সহকারী কমিশনারের কী ধরনের দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হয়?

  • নির্ভুলভাবে নির্বাহী কাজ পরিচালনা করতে হবে;
  • দ্রুতগতিতে কাজ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তার মতামত বা কাজের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে;
  • এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশের আইন-কানুন সম্বন্ধে জানতে হবে;
  • রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবগত থাকতে হবে;
  • যে কোন সমস্যা দ্রুত সমাধানের দক্ষতা থাকতে হবে;
  • যে কোন ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রত্যুৎপন্নমতি হতে হবে
  • প্রচুর পরিশ্রমী হতে হবে, কর্মজীবনের স্বার্থে ব্যক্তিগত অনেক কাজ বিসর্জন দিতে হবে
  • সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে এবং অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে, নিজের মূল্যবোধ রক্ষায় কঠোর হতে হবে।

বিসিএস পরীক্ষার ধাপ কী কী?

  • শুরুতে প্রিলিমিনারি টেস্ট হয় যেখানে ২০০ নম্বরের বহুনির্বাচনি প্রশ্নে পরীক্ষা হয়
  • এ ধাপে উত্তীর্ণ হলে ১১০০ নাম্বারের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়
  • লিখিত পরীক্ষায় ৫০ ভাগ নাম্বার পাওয়া পরীক্ষার্থীদের ভাইভার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়
  • ২০০ নাম্বারের ভাইভা ও বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মেডিকেল টেস্ট ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর পাবলিক সার্ভিস কমিশন চূড়ান্ত বাছাইকৃত প্রার্থীদের নাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়

তবে বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা থেকে মাত্র ৪৪ ভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় বাকি ৫৬ ভাগ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, পৌত্র-পৌত্রী, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী,নারী ও অনুন্নত জেলা গুলোর জন্য সংরক্ষিত।

একজন সহকারী কমিশনারের মাসিক আয় কেমন?

জাতীয় বেতন স্কেলের নবম গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। কর্মস্থল অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মাসিক ৩৫-৩৭ হাজার টাকা।

অ্যাডমিন ক্যাডারের কাজের ক্ষেত্র ও সুযোগ কেমন?

বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী দায়িত্ব পালনের জন্য প্রচুর অ্যাডমিন ক্যাডার দরকার পরে প্রতি বছর। অধিকাংশ বিসিএস পরীক্ষার সার্কুলারে সাধারণ ক্যাডার গুলোর মধ্যে সহকারী কমিশনার পদেই সবচেয়ে বেশি আবেদন চাওয়া হয়। সর্বশেষ ৩৮ ও ৩৭ তম বিসিএস পরীক্ষায় সহকারী কমিশনার পদ ছিল ৩০০ টি, ৩৬ তম বিসিএস পরীক্ষায় ছিল ২৫০ টি। অ্যাডমিন ক্যাডার হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ও বিভিন্ন পদে কাজের সুযোগ আছে। কমপক্ষে ২ বছর সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করার পর সরাসরি মন্ত্রণালয়ে কাজের সুযোগ হয় অথবা মাঠ প্রশাসনে পদোন্নতি হয় । এছাড়া পদোন্নতির মাধ্যমে একজন অ্যাডমিন ক্যাডার বাংলাদেশ সচিবালয়, সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়,সরকারের সকল অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে, বিভিন্ন কর্পোরেশনের প্রধান, বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাস, বেসামরিক বিমান পরিবহন কতৃপক্ষ, এফডিসি, সিটি কর্পোরেশন, জেলাপরিষদে কাজ করেন। প্রতিটা ক্যান্টনমেন্ট এ ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ নামের একটা পদ আছে অ্যাডমিন ক্যাডারের যে ক্যান্টনমেন্ট এর ভিতরের স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কবরস্থান, মসজিদ, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অভিভাবক।

একজন অ্যাডমিন ক্যাডারের ক্যারিয়ার কেমন হতে পারে?

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব অ্যাডমিন ক্যাডার হিসেবে। বিসিঅ্যাডমিন ক্যাডারে পদসোপান নিমরূপ

  • অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার
  • সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ( ইউএনও পদমর্যাদা)
  • ডেপুটি সেক্রেটারি( জেলা প্রশাসক পদমর্যাদা)
  • জয়েন্ট সেক্রেটারি
  • অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি
  • সেক্রেটারি

একজন জেলা প্রশাসক একটি জেলায় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। একজন জেলা প্রশাসক জেলা পর্যায়ে এমন ব্যক্তি যিনি সরাসরি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করবার ক্ষমতা রাখেন। সরকারের ডেপুটি সেক্রেটারি ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাগণের ৭৫ ভাগ কেবল অ্যাডমিন ক্যাডার থেকে নিযুক্ত হন এবং বাকি ২৫ ভাগ অন্যান্য ক্যাডার এর সিনিয়র অফিসার গনের জন্য উন্মুক্ত।
রাজনৈতিক দিক থেকে দেশকে পরিচালিত করেন মন্ত্রী, সাংসদরা। জাতীয় সংসদে আইন, নীতিমালা প্রণয়ন করেন। আর এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে নিবিড় ভুমিকা দাপ্তরিক প্রধান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সচিব ও সিনিয়র সচিবের। কেউ যদি নিজেকে দেশের পলিসি তৈরিতে যুক্ত দেখতে চান, স্বপ্ন দেখেন রুপান্তরের তিনি প্রশাসনের অংশ হওয়ার আগ্রহ দেখাতে পারেন।

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।