একজন ভালো গবেষকের দশটি গুণ

একজন ভালো গবেষকের দশটি গুণ - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

ক্যারিয়ার হিসেবে অনেকেই বেছে নেন গবেষকের জীবন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান ছাড়াও পরিসংখ্যান, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজারব্যবস্থা, মনোবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে গবেষণার নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। গবেষণা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাজ করাই প্রায় অসম্ভব। গবেষণায় ক্যারিয়ার বেছে নিতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই একজন ভাল গবেষক হতে হবে। একজন ভালো গবেষকের মধ্যে থাকা প্রয়োজন এরকম দশটি গুণ এক নজরে চলুন দেখে নেওয়া যাক।

১. একজন ভাল গবেষকের ভাল লিখিত ও কথ্য যোগাযোগের দক্ষতা থাকবে।

গবেষককে নিয়মিত কর্মরত অন্যান্য গবেষক, পরামর্শদাতাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। এছাড়া  গবেষণাক্ষেত্র বা মাঠে নিয়মিত মানুষের সাথে কথা বলতে হবে, তাদের কাছ থেকে তথ্য ও মতামত নিতে হবে। এজন্য ভাল গবেষককে একজন সামাজিক ব্যক্তি হয়ে উঠতে হবে। এছাড়া গবেষণা কাজেও বিভিন্ন মানুষের সাথে ক্রমাগত আপনার যোগাযোগ করতে হবে। গবেষণার কাজটি মানুষের কাছে বোধগম্য উপায়ে পৌঁছাতে হবে।

২. গবেষক হবেন বিশ্লেষণী মনোভাবের অধিকারী।

গবেষককে কোন একটা নির্দিষ্ট অবস্থা, ঘটনা বা পরীক্ষণকে যেমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে বুঝতে পারতে হবে, তেমনি এর বিকল্প অবস্থা, বা বিস্তৃত কারণও অনুসন্ধান করতে পারতে হবে। প্রতিনিয়ত তিনি নতুন নতুন তথ্য পাবেন। এগুলোকে বিশ্লেষণ করার জন্য তাঁর প্রখর তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকতে হবে।

৩. তাঁকে যে কোন পরিস্থিতে শান্ত ও স্থির থাকতে হবে।

গবেষণাক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। যেমন, পরিকল্পনামত পরিস্থিতি সেখানে না-ও থাকতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কোন একটা ভুল বের হতে পারে,  কিংবা ডেডলাইন নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে গবেষককে শান্ত থাকতে হবে ও যৌক্তিক চিন্তা করে সঠিকভাবে কাজ সমাধা করতে হবে। গবেষককে মনোযোগ নিবদ্ধ করে দ্রুত চিন্তা করতে পারতে হবে।

৪. গবেষণা কাজে নতুন ফলাফল নিয়ে আসার জন্য পূর্বানুমান থেকে গবেষককে বের হয়ে আসতে হবে।

গবেষণা মানেই নতুন কিছু বের করে আনা, যেটি খালি চোখে দেখা যাচ্ছে বা সহজেই বোঝা যায় সেটি দেখানো গবেষকের কাজ নয়। এজন্য গবেষকের কাজে অবশ্যই থাকতে হবে বুদ্ধিমত্তা ও মননশীলতা। এছাড়া তাঁকে সকল সম্ভাবনা ও ঘটনা সম্বন্ধে ইতিবাচক থাকতে হবে। পূর্বনির্ধারিত কোন ধারণা যদি তার মনে গেঁথে থাকে, তাহলে তাঁকে মনে রাখতে হবে যে, যেকোন নতুন মাত্রা বা প্রেক্ষিত থেকে একটি বিষয়কে দেখা যেতে পারে। যেমন, নৃবিজ্ঞানের গবেষকদের প্রতিনিয়ত নতুন সংস্কৃতি ও সমাজের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁরা যদি নিজ সংস্কৃতির নির্ধারিত মনোভাব নিয়ে অপর সমাজকে বিচার করতে যান তবে তাঁদের গবেষণা কাজ সংস্কৃতিকেন্দ্রিকতার (ethnocentrism) কারণে সমালোচিত এবং অগ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

৫. ভাল গবেষক হবেন অনুসন্ধিৎসু ও দক্ষ পর্যবেক্ষক।

শুধু বুদ্ধিমত্তা থাকলেই যে একটি বিষয়ের গভীরে যাওয়া সম্ভব, তা নয়। এজন্য ভাল গবেষককে হতে হয় অনুসন্ধিৎসু- যিনি একটি বিষয়, ঘটনা বা অবস্থার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার জানবার জন্য সর্বদা উৎসাহী থাকবেন। তিনি গবেষণাক্ষেত্রের যেকোন বিষয় মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করবেন। শুধু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও অনেক জরুরি তথ্য বের করে আনা সম্ভব!

৬. গবেষক তাঁর কাজ ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিশীল হবেন, তাঁর স্পষ্ট নৈতিকতাবোধ থাকবে।

ভাল গবেষক তাঁর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গবেষণা কাজ শেষ করবেন। এছাড়া, কাজের সময় নৈতিকতা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। যেমন, গবেষণাপত্র প্রকাশের সময় দাতা সংস্থা, স্পন্সর, গবেষণাসংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অনুমতি নেওয়া, গবেষণার কাজে যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে তাদের অনুমতি নেওয়া ও তাদেরকে গবেষণার বিষয় ও লক্ষ্য সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে জানানো, গবেষণাক্ষেত্রের যাতে ক্ষতিসাধন না হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা ইত্যাদি। একজন ভাল গবেষক অবশ্যই এসকল বিষয়ে সচেতন থাকবেন।

৭. গবেষককে সহানুভূতিশীল হতে হবে।

গবেষককে গবেষণা কাজ, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী, সহকর্মী ও ক্ষেত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। ধরুন একজন মনোবিজ্ঞানী কোন একটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি যদি মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল না হন এবং তার সমস্যা উপলব্ধি করতে না পারেন, তবে কখনোই সেই মানুষের বক্তব্য শোনার দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন না। ফলে তিনি ভাল গবেষণা করতে ব্যর্থ হবেন।

৮. গবেষকের কাজ হবে প্রণালীবদ্ধ ও পরিকল্পনামাফিক।

ভাল গবেষক তাঁর গবেষণা পদ্ধতি সম্বন্ধে স্পষ্ট থাকবেন। তিনি প্রত্যেকটি তথ্য সঠিক কিনা তা বারবার মিলিয়ে দেখবেন এবং নিশ্চিত হবেন। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। প্রত্যেকটি কাজ যেমন গবেষণা প্রশ্ন, গবেষণা প্রস্তাবনা, পূর্ববর্তী কাজের পুনরালোচনা, মাঠকর্ম, তথ্য বিশ্লেষণ ইত্যাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা করে রাখবেন তিনি। তবেই তাঁর কাজটি ত্রুটিমুক্ত হবে।

৯. গবেষককে সবসময় নতুন কিছু শিখতে থাকবেন এবং সমালোচনার ব্যাপারে ইতিবাচক থাকবেন।

গবেষককে মনে রাখতে হবে, তাঁর গবেষণা কাজ কোন শাশ্বত বিষয় নয়। তাঁর কাজের সমালোচনা হবে এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই নতুন কোন কাজ হবে। এ থেকে গবেষক যেমন তাঁর ধারণাকে শাণিত করতে পারবেন তেমনি পরবর্তীতে আরও ভাল কাজ করবার সামর্থ্য অর্জন করবেন। এ বিষয়ে তাঁর ইতিবাচক মনোভাব থাকা জরুরি। এছাড়া গবেষকের ক্যারিয়ার মানে ক্রমাগত নিজের জ্ঞান ও গবেষণা পদ্ধতিকে সমৃদ্ধ করবার জীবন। তিনি প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান ও গবেষণা কাজ সম্বন্ধে জানতে থাকবেন। তাঁকে সাম্প্রতিক গবেষণা কাজ, নতুন তত্ত্ব ও ধারণা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে।

১০. গবেষণা কাজের অর্থায়ন সংগ্রহের ব্যাপারেও গবেষক দক্ষ থাকবেন।

গবেষণা কাজের একটি বড় বিষয় হল অর্থায়ন। অর্থাভাবে অনেক ভাল গবেষণা কাজ থেমে থাকতে পারে। এজন্য অর্থদাতা সংস্থার সাথে যোগাযোগ তৈরি এবং সেখানে গ্রহণযোগ্য গবেষণা প্রস্তাব লিখার ব্যাপারে গবেষককে দক্ষ হতে হবে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা কী ধরনের গবেষণা কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায় সে বিষয়ে ভাল জ্ঞান থাকতে হবে। তাঁকে আরও খেয়াল রাখতে হবে, তিনি যে বিষয়ের উপর গবেষণা করতে যাচ্ছেন তাতে কোন কোন সংস্থা আগ্রহী।

Loading

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।