মেরিন ইঞ্জিনিয়ার

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার: ক্যারিয়ার প্রোফাইল - ক্যারিয়ারকী (CareerKi)

সাগরপাড়ি দিতে আগ্রহী কিংবা সাগরে কাজ করতে চান এমন ব্যক্তিদের জন্য মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের ক্যারিয়ার বেশ পছন্দসই হতে পারে। চিরস্থায়ী সাগরপাড়ি দেওয়া না গেলেও এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুযোগ মেলে এবং কাজের মধ্যে দেশভেদে বৈচিত্র পাওয়া যায়। দেশভেদে বৈচিত্র অবলোকন করা গেলেও মাসের পর মাস জাহাজে কাটানো অনেকের ক্ষেত্রেই একঘেয়ে লাগতে পারে এবং এমন একই ঘরানার কাজ যদি নিয়মিত না করতে চান সেক্ষেত্রে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কাজ আপনার জন্য নয়।

এক নজরে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার

সাধারণ পদবী: মেরিন ইঞ্জিনিয়ার
বিভাগ: ইঞ্জিনিয়ারিং
প্রতিষ্ঠানের ধরন: প্রাইভেট ফার্ম/কোম্পানি
ক্যারিয়ারের ধরন: ফুল টাইম, চুক্তিভিত্তিক
লেভেল: এন্ট্রি, মিড
এন্ট্রি লেভেলে অভিজ্ঞতা সীমা: ০ – ১ বছর
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য বেতনসীমা: ৳১৫,০০০ – ৳৩০,০০০
এন্ট্রি লেভেলে সম্ভাব্য বয়সসীমা: ২২ – ২৮ বছর
মূল স্কিল: সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান, জাহাজ চালানো ও মেরামতের জ্ঞান, সামুদ্রিক আইন সংক্রান্ত ধারণা
বিশেষ স্কিল: সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা, ধৈর্য

একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার কোথায় কাজ করেন?

মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কর্মক্ষেত্র সাধারণত দুই ধরনের হয়। আপনি যদি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ পেতে চান সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রথমে কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে হবে। আপনার প্রতিষ্ঠান আপনাকে একটি জাহাজ নির্দিষ্ট করে দিবে যার যাত্রা আপনার সমাপ্ত করে পুনরায় প্রস্থানবন্দরে ফিরে আসতে হবে। জাহাজগুলো সাধারণত মালবাহী হয়। এক্ষেত্রে গাড়ি, তেল ট্যাংকার, কেমিক্যাল ট্যাংকার, কন্টেইনার, বিভিন্ন আসবাবপত্র সহ প্রভৃতি বড় আকারের দ্রব্য ও পণ্য জাহাজগুলো এক বন্দর হতে অপর বন্দরে বহন করে নিয়ে যায়। একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে একটি জাহাজের সমগ্র যাত্রা সাফল্যের সাথে সমাপ্ত করতে হয়। এক্ষেত্রে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের দুইটি কাজের বিভাগ হল –

১। নটিক্যাল বা ডেক
২। ইঞ্জিন

এ দুটি বিভাগ ছাড়াও বন্দরের কিছু কাজ একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের করা লাগতে পারে। নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানই থাকে। তবে ভালো কাজের জন্য সাধারণত সবাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানই প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখেন।

একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার কী ধরনের কাজ করেন?

  • মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কাজের ধরন ডেক ও ইঞ্জিনভেদে আলাদা হয়। জাহাজের ক্ষেত্রে ন্যাভিগেশন ও সাউন্ডিং নেওয়াসহ মেরিন প্রকৌশল সংক্রান্ত বেশ কিছু কাজ করা লাগে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে। ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করতে যারা আগ্রহী তাদের জন্য ডেক বা নটিক্যাল-এ ন্যাভিগেশন এর কাজ করা কষ্টসাধ্য হতে পারে;
  • বন্দরের কাজের ক্ষেত্রে জাহাজ নোঙ্গর, দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের পূর্বাভাস সহ সাগরের অবস্থা নজরে রাখার দায়িত্ব একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের উপর অর্পিত থাকে। তবে এক্ষেত্রে জাহাজের ক্যাপ্টেন অথবা উচ্চপদস্থ কোন অফিসারের হাতেই সাধারণত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে;
  • ডেক ক্যাডেট বা অফিসারের ক্ষেত্রে জাহাজ কবে কোথায় পৌঁছাবে সে হিসাব রাখতে হবে। নির্দিষ্ট গন্তব্য বন্দর-এ কোন পথে পৌঁছানো যাবে এবং জাহাজ ঠিক পথে আছে কিনা অর্থাৎ ন্যাভিগেশন-এর কাজ করতে হয়। ঝড়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন ও নিশ্চিতকরণ-এর দায়িত্ব আপনার উপর অর্পিত হবে যদি আপনি একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হন। মেরিন প্রকৌশলে খুঁটিনাটি পড়ানো হয় এমন বিষয়াদি বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হয় একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে;
  • মোদ্দা কথা, জাহাজ চালানো, জাহাজের মেরামত অথবা ইঞ্জিন বা মেশিন সম্পর্কিত কোন সমস্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণের সমগ্র কাজ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার কী ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়?

শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ যে কোন মেরিন প্রকৌশল ইন্সটিটিউট বা মেরিন একাডেমি থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি আছে এমন যে কাউকেই নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। মেরিন একাডেমিগুলো সাধারণত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট করে। এক্ষেত্রে ২০০ নম্বরের একটি ভর্তি পরীক্ষা হয় সাধারণ জ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজী – এই ৪টি বিষয়ের উপর।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং এর কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়োগ দেয় না বরং নিয়োগ হয় সরাসরি প্রতিষ্ঠানে। কর্মক্ষেত্রে যোগদানের পরে একজন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে একটি জাহাজের কাজে নিযুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে একটি জাহাজের প্রস্থান ও গন্তব্যস্থলে পৌঁছে পুনরায় ফিরতে ভ্রমণকাল সাধারণত ২ থেকে ৬ মাসের মধ্যে হয়। সময়ের বিষয়টি জাহাজ ও গন্তব্যসাপেক্ষ।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়তে আপনাকে অবশ্যই উচ্চমাধ্যমিক পাস হতে হবে। সাঁতার জানেন না এমন কাউকে সাধারণত মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট বা একাডেমিগুলোতে ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয় না। সাঁতার না জানলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কাজ করা সম্ভব নয়।

একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কী ধরনের দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হয়?

  • মেরিন প্রকৌশলে যেসব বিষয় পড়ানো হয় সেসব নিয়ে আপনার ভালো ধারণা থাকা জরুরী;
  • মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কাজের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বাস্তবিক জ্ঞান অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর শিক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণত সিমুলেশন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে জাহাজে নিযুক্ত হলে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সিমুলেশনের সময় যে সকল জ্ঞান লাভ করেছেন এবং যে সকল পরিস্থিতি তৈরি করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে সেসব অভিজ্ঞতার যথাযোগ্য ব্যবহার জাহাজ চালানোর ক্ষেত্রে তাদের নিশ্চিত করতে হয়;
  • ন্যাভিগেশনের খুঁটিনাটি জানতে হবে;
  • জাহাজ চালানোর ক্ষেত্রে পারদর্শিতা এবং হঠাৎ উদ্ভূত সমস্যার চমৎকার সমাধান দিতে পারা ব্যক্তিদের পদোন্নতি দ্রুত হওয়ার সুযোগ সাধারণত বেশি হয়;
  • ভালো সাঁতার জানা জরুরী। সিমুলেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের সময় রোলিং-পিচিং জাতীয় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় শিক্ষার্থীদের। এক্ষেত্রে দেখা যায় যারা সাধারণত জাহাজে নতুন ভ্রমণ করেন, তারা সাগরে রোলিং এবং পিচিং-এর সময়ে ভারসাম্য রাখতে পারেন না। একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারকে সেই ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সচেষ্ট হতে হবে;
  • মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের কাজ বেশ কঠিন এবং সাগরের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াও এক্ষেত্রে একটি বড় গুণ। সাগরে অনেকদিন পরিবার-পরিজন ছেড়ে থাকতে হয় এজন্য বলা হয়ে থাকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারদের কোন ব্যক্তিগত জীবন নেই। একাকী এভাবে পরিবার-পরিজন ছাড়া সাগরে থাকার কারণে কাজের ক্ষেত্রে একঘেয়েমী লাগার সম্ভাবনা বেশ প্রবল। যারা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতে চান তাদের এ বিষয়গুলো বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কাজের ক্ষেত্রে কোনভাবেই একঘেয়েমী ও বিরক্তি আনা যাবে না নইলে আপনার ক্যারিয়ার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক্ষেত্রটি এমন একটি ক্যারিয়ার যা থেকে অন্য ক্যারিয়ারে পরিবর্তিত হওয়া বেশ কঠিন একটি কাজ। তাই মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-কে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে আপনি এর জটিল অংশগুলোর জন্য প্রস্তুত কিনা তা নিজেই যাচাই করে নিবেন।

একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের মাসিক আয় কেমন?

এক্ষেত্রে মাসিক আয়ের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষ হয় সাধারণত একটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যদি আপনাকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি হয় সেক্ষেত্রে আপনার মাসিক আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি হবে আবার যদি কোন দেশি প্রতিষ্ঠানে আপনি নিযুক্ত থাকেন সেখানে আপনার মাসিক আয় হবে তুলনামূলকভাবে বেশ কম। দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে নিয়োগের প্রথম পদ অর্থাৎ ডেক ক্যাডেট বা ইঞ্জিন ক্যাডেটের মাসিক আয় সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ডেক বা ইঞ্জিন ক্যাডেটের মাসিক আয় সাধারণত ২০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলারের মত হয়। বিষয়টি কিছুটা প্রতিষ্ঠানসাপেক্ষ হলেও এক্ষেত্রে পদভেদে মাসিক আয় হতে পারে সাধারণত নিম্নরূপ –

৫ম ইঞ্জিনিয়ার – ৫০০ থেকে ১২০০ মার্কিন ডলার
৪র্থ ইঞ্জিনিয়ার ও ৪র্থ মেট – ৭০০ থেকে ২০০০ মার্কিন ডলার
৩য় ইঞ্জিনিয়ার ও ৩য় মেট – ১৫০০ থেকে ২৫০০ মার্কিন ডলার
২য় ইঞ্জিনিয়ার ও ২য় মেট – ২৫০০ থেকে ৪০০০ মার্কিন ডলার
চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও চিফ মেট – ৫০০০ থেকে ৮০০০ মার্কিন ডলার
ক্যাপ্টেন – ৭০০০ থেকে ১৫০০০ মার্কিন ডলার

একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের ক্যারিয়ার কেমন হতে পারে?

মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দুটি ক্ষেত্রেই সাধারণত নিয়োগ হওয়ার প্রথম পদ হল ক্যাডেট। ডেক বা নটিক্যাল বিভাগের পদবিন্যাস যথাক্রমে নিম্নরূপ –
১। ডেক ক্যাডেট
২। ৪র্থ মেট
৩। ৩য় মেট
৪। ২য় মেট
৫। চিফ মেট
৬। ক্যাপ্টেন
অপরদিকে ইঞ্জিন বিভাগের পদবিন্যাস যথাক্রমে নিম্নরূপ –
১। ইঞ্জিন ক্যাডেট
২। ৫ম ইঞ্জিনিয়ার
৩। ৪র্থ ইঞ্জিনিয়ার
৪। ৩য় ইঞ্জিনিয়ার
৫। ২য় ইঞ্জিনিয়ার
৬। চিফ ইঞ্জিনিয়ার
প্রতিটি পদোন্নতির জন্য আপনার আলাদা করে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া লাগবে। পদোন্নতি পরীক্ষায় আপনি উত্তীর্ণ না হলে আপনি পদোন্নতি পাবেন না।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

১. সালমান শিকদার সৈকত, ডেক ক্যাডেট, মেরিন হাইভ লিমিটেড, ফেব্রুয়ারি ২০১৮ থেকে বর্তমান; সাবেক ডেক ক্যাডেট, ভ্যানগার্ড ম্যারিটাইম লিমিটেড, জুলাই ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০১৭

২. কামরুল হাসান, শিক্ষানবিশ ক্যাডেট, এমওএল কেমিক্যাল ট্যাংকারস প্রাইভেট লিমিটেড, জানুয়ারি ২০১৮ থেকে বর্তমান

Loading

Leave a Reply

আপনার নাম ও ইমেইল ঠিকানা দেয়া আবশ্যক। তবে মতামতের সাথে ইমেইল দেখানো হবে না।